দিন সন্ধ্যায় অবনীবাবুর বাড়িতে অফিসফেরত অরিত্র খবর আনলো তার মেয়ে উর্মি
কোলকাতার নামকরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে চান্স পেয়েছে। চার বছরের একফোঁটা
মেয়ের পক্ষে বারুইপুরের এই গন্ডগ্রাম থেকে রোজ কোলকাতায় যাতায়াত করা সম্ভব
নয়। তাই বাধ্য হয়েই বালিগঞ্জে ফ্ল্যাট ভাড়া করবে ওরা। সেখান থেকে উর্মির
স্কুল খুব কাছে। অরিত্র'র অফিস যাতায়াতও সহজ। বৌমা বললো, ছুটিছাটায় আসবো
বাবা। এছাড়া আপনার ছেলে প্রত্যেক সপ্তাহে শনিবারে চলে আসবে। লোকাল ট্রেনে তো
মোটে চল্লিশ মিনিট। কিচ্ছু চিন্তা করবেন না। অবনীবাবুর আকাশে মনখারাপের মেঘ
জমলো।
উর্মিকে রোজ সকালে পাড়ার স্কুলে নিয়ে যেতেন তিনি। ভোরবেলায় প্লে-স্কুলের
মাঠে রবীন্দ্রনাথের গানে প্রার্থনা হতো প্রতিদিন। অবনীবাবু এককোনে দাঁড়িয়ে
শুনতেন। বুক ভর্তি করে টেনে নিতেন নির্মল সুস্থ বাতাস সারাদিন ধরে একটু একটু
করে খরচ করবেন বলে। দাদু, আমায় তবে মহাভারতের গল্পগুলো শোনাবে কে?
উপেন্দ্রকিশোরের লেখা বই থেকে অবনীবাবু রোজ পড়ে শোনান উর্মিকে। ও দাদু, বলোনা
কে আমায় বলবে বকরাক্ষস ঘটোৎকচ আর গান্ধারী কুন্তি দ্রৌপদীর গল্প? ডুকরে ওঠে
একরত্তি মেয়ে।
ওরা চলে গেলে ফাঁকা বাড়ি খাঁখাঁ করে। বাড়ির উঠোনে তুলসিমঞ্চের পাশে রথের
মেলায় কেনা রক্তকরবী গাছ ফুলের ভারে নুয়ে পড়ে। বৃদ্ধবয়স এমনিতেই নির্জন।
বাজারের ভিড়ে নিজেকে বড়ো একা মনে হয়। উবু হয়ে বসে সব্জিবুড়ির সঙ্গে গল্প
করেন অবনীবাবু। সবুজে হলুদে মেশা পেলব পেয়ারা কেনেন। কেনেন লালশাক আর সজনেফুল।
ছুটির দুপুরে উর্মির সাথে খেতে বসতেন। এখন মনোরমার সঙ্গে বসেন। মনোরমা যত্ন করে
ভাত বেড়ে দেন। ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেন জমাট বাঁধা মেঘের ভ্রুকুটি। অবনীবাবু
স্টীলের থালায় লালশাকে ভাত মাখেন। ঝকঝকে থালা টুকটুকে রঙিন হয়ে ওঠে।
মনখারাপের বিকেলটুকু গড়িয়ে গেলে মনোরমা সারদামায়ের ছবির সামনে বসে অন্তরের
গ্লানি আর সংশয়ভার মুক্ত হতে চান। পার্কের বেঞ্চে একাকী অবনীবাবুর ক্লান্ত
চোখের সামনে শিশিরের শব্দের মতো সন্ধ্যে নামে।
সন্ধ্যেবেলায় ভিডিও কলে উর্মি আসে। কলকলিয়ে হাসে। রাইম শোনায়। পর্দা জুড়ে
বাঁধভাঙা ফুলের হাসি উছলে পড়ে। দিদুন কই? দিদুন তুমি আমার জন্যে বড়োদিনের
ছুটিতে গোকুল পিঠে বানাবে কিন্তু। রাত্তিরে রোজ তোমার পাশে লেপমুড়ি দিয়ে
শুয়ে কলাবতী রাজকন্যের গল্প শুনবো, মনে থাকে যেন।
দিদুন, আমার কোলকাতা একটুও ভাল্লাগে না দিদুন। সন্ধ্যে হলেই তোমার জন্যে খুব
মনকেমন করে। করুণ কচিগলার আর্তি। মোবাইলের পর্দা অশ্রুবাষ্পে ঝাপসা হয়ে
যায়।
পরদিন কাকভোরে দরজায় ঠুকঠুক। মনোরমা উঠে দেখেন কাজের মাসির মেয়ে আমিনা। তার
জোড়া করতলে একরাশ সদ্যফোটা শিউলি ফুল। একগাল শিউলিফুলের মতো হাসি। ও মেয়ে,
তুই একটু দাঁড়া মা। ওর ছেঁড়াজামা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে উর্মির গোলাপি ফ্রকটি এনে
ওকে পরিয়ে দিলেন মনোরমা। যত্ন করে চুল আঁচড়ে মাথায় দিলেন ঝলমলে হেয়ার
ব্যান্ড। মোবাইল এনে হাঁটুগেড়ে বসে সেলফি নিলেন। তারপর বাসিমুখে আমিনার গালে
একটা গভীর চুমু খেলেন। যেমন উর্মিকে খেতেন রোজ। হেমন্তের মায়াবী সকাল তখন
আলোয় আলোয় ভরে গেল।
0 মন্তব্যসমূহ