|| এক ||
মাদের ছোটবেলায়, কলকাতা শহরকে ব্যঙ্গ করে ডাকা হত ‘লোডশেডিং নগরী’ নামে।
যখন স্কুলে পড়তাম, এই ধরুন আজ থেকে চোদ্দ/পনেরো বছর আগে, তখন কলকাতায়
লোডশেডিং প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা ছিল। সারাটা বিকেল খেলাধুলোর পর বাড়ি ফিরে
পড়তে বসলেই লোডশেডিং হয়ে যেত। দারুণ মজা লাগত তখন, কারণ গরমের দোহাই দিয়ে
বই-খাতা গুটিয়ে ফেলতাম। আর তাই দেখে বাবা তাঁর ট্রেডমার্ক স্টাইলে লাঞ্ছনা
করে বলতেন— ‘কী রে, কয়েকঘণ্টার লোডশেডিং, তাতেই হাঁপিয়ে উঠছিস! জানিস,
বিদ্যাসাগর মশাই রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোয় পড়াশোনা করতেন?’ তুলনাটা তখন
ছোট মাথায় বেশ রাগ চড়িয়ে দিত, বিদ্যাসাগর মশাইকে হিংসে হত যথেষ্ট। আবার
একইসাথে কৌতূহলও জাগত, আমরা এই কয়েক মুহূর্ত ইলেকট্রিক আলো, পাখা ছাড়া
থাকতে পারছি না, তাহলে তখনকার মানুষ সারাক্ষণ হাতপাখার হাওয়া আর মোমবাতির
আলোয় কী করে থাকতেন?
|| দুই ||
একটু ভুল বললাম, কলকাতা শহরে মোমের আলো তো এসেছে বেশ পরে, দীর্ঘদিন পর্যন্ত
সাধারণ মানুষের ঘরে টিমটিমে প্রদীপ শিখাই ছিল অন্ধকারের একমাত্র সম্বল। সূর্য
ডোবার সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকারে ডুবে যাওয়া একটি শহর থেকে ইলেকট্রিক আলোয় সেজে
ওঠা ঝলমলে আনন্দনগরী হতে কলকাতার সময় লেগেছিল কমবেশি একশো বছর।
আজ থেকে দু’শো বছর আগে, ঠিক কেমন ছিল কলকাতার আলোর বন্দোবস্ত? উনিশ শতকের
গোড়ায় ধনীদের অট্টালিকার সদর দরজায় একটি করে আলো থাকত কেবল, বাবুরা রাতে
বেরোতেন মশালচি সঙ্গে নিয়ে। ঘরের ভিতরে জ্বলত মূলত নারকেল, সরষে ও রেড়ির
তেলের প্রদীপ। কলকাতার ইতিহাসের পাতা ওল্টালে জানা যাবে, ১৮২৩ সালে শহরে
উন্নয়নের দায়িত্বে থাকা লটারি কমিটিই প্রথম ঠিক করে, কেরোসিনের আলোয় শহরের
রাস্তা আলোকিত করতে হবে। সেই মত, লালদিঘির (বি-বা-দী বাগ) চারপাশে দশটি লোহার
বাতিস্তম্ভে কেরোসিনের আলোর ব্যবস্থা করা হয়। এরপর ধীরে ধীরে সেই বন্দোবস্ত
ছড়িয়ে পড়ে চৌরঙ্গী রোড, স্ট্র্যান্ড রোড, পার্ক স্ট্রিট, চাঁদপাল ঘাট,
এসপ্ল্যানেড, গভর্নমেন্ট হাউস ও সংলগ্ন সাবেকি ‘সাহেবপাড়া’
এলাকায়।
এটাই স্বাভাবিক, কেননা এই শহরের সব আধুনিক পরিষেবা সবার আগে সাহেব
অধিবাসীরাই তো উপভোগ করতেন !
একদম শেষে কেরোসিন আলোর পরিষেবা পৌঁছয় সিমলা, কর্নওয়ালিস স্ট্রিট,
জোড়াসাঁকো-সহ উত্তর কলকাতার কতকাংশে। তবে ‘ব্ল্যাক টাউনে’র রাস্তায়
বাতিস্তম্ভ বসতে বসতে ১৮৫০-এর দশক চলে এসেছিল। ১৮৫৭ সাল নাগাদ কলকাতার
বিভিন্ন রাস্তায় সব মিলিয়ে ৩১৩টি তেলের বাতি জ্বলত, সেই আলোর তেজ ছিল যথেষ্ট,
যা দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন বালক রবীন্দ্রনাথও।
|| তিন ||
১৮৫৪ সালে প্রতিষ্ঠা হয় ওরিয়েন্টাল গ্যাস কোম্পানির। ১৮৫৭ সালের জুলাই মাস
থেকে তাদের ব্যবস্থাপনাতেই পাকাপাকি ভাবে শহরের রাস্তায় বসতে শুরু করে
গ্যাসের আলো। ইংল্যান্ডে অবশ্য এর চাইতে ঢের আগে গ্যাসবাতির ব্যবহার শুরু হয়ে
গিয়েছিল। যাই হোক, ওরিয়েন্টাল গ্যাস কোম্পানি কলকাতার রাস্তায় ৬০০ বাতি বসাতে
অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। খরচ হয় প্রায় ৫৪,০০০ টাকা। আলো জ্বালাতে যে গ্যাসের দরকার
হত, তার যোগান দিতে বর্তমান মহম্মদ আলি পার্কের জায়গায় (তখনকার হ্যালিডে
স্ট্রিটে) বসেছিল কোম্পানির প্রথম গ্যাস প্লান্ট। গ্যাসবাতির নকশাদার
লৌহ-স্তম্ভ, তার ব্র্যাকেট, কাঁচের মোড়ক সব নিয়ে আসা হত ইংল্যান্ড থেকে।
গোটা শহরজুড়ে তখন এক মহা হৈ হৈ ব্যাপার।
পরবর্তী চার/পাঁচ বছরের মধ্যে কলকাতার নানা ছোট-বড় রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে
শৌখিন গ্যাসবাতির রমরমা। আমড়াতলা স্ট্রিটে (চারটি), ব্যাঙ্কশাল স্ট্রিটে
(দুটি), বারাণসী ঘোষ স্ট্রিটে (তেরোটি), বউবাজার স্ট্রিটে (একত্রিশটি),
চৌরঙ্গী রোডে (ছাপ্পান্নটি), ময়দানে (আটাত্তরটি) ও আরও অন্যান্য জায়গায়।
কালক্রমে পাইপলাইনের সাহায্যে গ্যাসের আলো ঢুকে পড়ে উচ্চ ও মধ্যবিত্তের
অন্দরমহলেও।
একটা ছোট্ট পরিসংখ্যান দিলে বুঝতে সুবিধা হবে যে, উনিশ শতকের কলকাতায়
গ্যাসের আলো ঠিক কতটা জনপ্রিয় হয়েছিল; ১৮৬১-৬২ সালের সরকারি হিসাব বলছে, তখন
কলকাতায় গ্যাসবাতির সংখ্যা ছিল ৮৪৮টি। ১৯১৪-১৫ সালে এই সংখ্যা বেড়ে
দাঁড়িয়েছিল ১১৯০০টি। আর ঐ বছরে কলকাতার রাস্তা গ্যাসালোকে আলোকিত করতে
সরকারের ব্যয় হয়েছিল প্রায় আট লাখ টাকা।
|| চার ||
কেবল সংখ্যা বৃদ্ধি নয়, তাদের নিয়মমাফিক দেখভালও করা হত। গরমকালে প্রত্যেক
রাতে দশ ঘণ্টা করে জ্বলত রাস্তার বাতি। ডিসেম্বর মাসে আবার আলো জ্বালানোর
সময়সীমা ছিল বারো ঘণ্টা, যেহেতু শীতকালে সন্ধ্যা নামে তাড়াতাড়ি। সেগুলি
জ্বালানো-নেভানো হত সময় মেনে। পুরকর্মীদের তখন দম ফেলবার সময় নেই, রাত-দিন
ছুটতে হত শহরের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত।
মই বেয়ে ল্যাম্পপোস্টে উঠে প্রথমে তারা ন্যাকড়া বুলিয়ে পরিষ্কার করতেন আলোর
কাঁচের মোড়ক। তারপর চাবি ঘুরিয়ে চালু করা হত গ্যাস। সব শেষে দেশলাই জ্বালিয়ে
ধরানো হত বাতি। হুতোম লিখছেন, “সন্ধ্যার সময়ে একটা সিঁড়ি ঘাড়ে করিয়া কে একটা
লোক দৌড়িতে দৌড়িতে এই রূপ ঝাঁ ঝাঁ করিয়া গ্যাস লণ্ঠন সকল জ্বালাইয়া
যায়...”।
গ্যাসবাতির ঔজ্জ্বল্যে মুগ্ধ শহরের প্রতিনিধি, নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্র
লিখলেন, “জ্বলিতেছে দীপপুঞ্জ জ্বলিতেছে পাখা, /গ্যাসালোকে কলিকাতা যেন
আভামাখা।” আর মহারাজ সৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুর তো ১৮৭৭-এ ঘটা করে প্রকাশ করলেন
‘ভিক্টোরিয়া গীতিমালা’ গ্রন্থ। তাতে এককদম এগিয়ে মহারানী ভিক্টোরিয়ার প্রতি
ভৈরবীর সুরে নিবেদন করে বসলেন— “এ হেন গ্যাসের আলো হেরিনু তব কৃপায়।”
গ্যাসালোকে উজ্জ্বল কলকাতা তখন যেন ‘স্বর্গের জ্যেষ্ঠ সহোদর’।
|| পাঁচ ||
গ্যাসবাতি নিয়ে কলকাতাবাসীর এহেন উচ্ছাস অবশ্য বেশিদিন টিঁকল না। সরকার
বলল, যেসব রাস্তায় গ্যাসের আলো বসবে সেই সব রাস্তার ধারের বাড়ি থেকে অতিরিক্ত
কর আদায় করা হবে। কারণ, গ্যাসবাতির রক্ষণাবেক্ষণের পেছনে ফিবছর সরকারের
ভালোরকম খরচা হচ্ছিল। সুতরাং সেই টাকা নাগরিকদের কাছ থেকেই উসুল করতে হবে।
বাতি বসানোর আড়ালে সরকারি ট্যাক্স বৃদ্ধির এই কৌশল, জনতার মনে ক্ষোভ জমিয়ে
তুলল। মানুষ প্রতিবাদ করল, খবরের কাগজে লেখালেখিও হল বিস্তর। যদিও শেষ
পর্যন্ত তারা পুরোটা মেনেই নিল, কলকাতা শহরের উন্নত পরিষেবার স্বার্থে।
এক সময় গ্যাসবাতির রমরমাও অতীত হল, এল ইলেকট্রিকের আলো। ১৮৮৯ সালে
সদ্যনির্মিত হ্যারিসন রোড (এখন যেটি পরিচিতি মহাত্মা গান্ধী রোড নামে)
বিজলিবাতির আলোয় সাজিয়ে তুলতে সরকারি পরিকল্পনা নেওয়া হল। যদিও তার বাস্তবায়ন
ঘটেছিল আরও কয়েকবছর পর।
বিজলিবাতির আগমনবার্তা অবশ্য ঘোষিত হয়েছিল বহু আগেই। টেলিগ্রাফ বিভাগের
ইঞ্জিনিয়ার কার্ল লুই শোয়েন্ডলারের চেষ্টায় হাওড়া স্টেশনের দু’টি
প্ল্যাটফর্মে প্রথম ইলেকট্রিকের আলো জ্বলে ওঠার আগেই, শহরে বৈদ্যুতিক আলোর
পরীক্ষামূলক প্রদর্শন করে ‘পি. ডব্লিউ. ফ্লুরি অ্যান্ড কোম্পানি’। তারিখ,
১৮৭৯-এর ২৪ শে জুলাই।
তবে শোয়েন্ডলারের পরীক্ষার এক বড় প্রাপ্তি ছিল বিদ্যুৎ সংক্রান্ত কাজে
এদেশীয়দের হাতেখড়ি। শোয়েন্ডলার তাঁর রিপোর্টে স্থানীয় কারিগরদের দক্ষতার
ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন, সেই ধারাতেই বিজলিবাতির কারবারে প্রথম বাঙালি
উদ্যোগের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ১৮৮১-এর ৩০শে জুন গার্ডেনরিচে ম্যাকিনন অ্যান্ড
ম্যাকেঞ্জি কোম্পানির সুতাকলে ৩৬টি ইলেকট্রিক বাল্ব জ্বালিয়ে তাক লাগিয়ে দেয়
ওয়েলিংটন স্ট্রিটের ‘দে শীল অ্যান্ড কোম্পানি’।
|| ছয় ||
এরপর এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ১৮৯৫ সালে ‘ক্যালকাটা ইলেকট্রিক লাইটিং অ্যাক্ট’
পাশ করে বাংলার সরকার, তার দু’বছর পর শহরে বৈদ্যুতিক আলো পৌঁছনোর দায়িত্ব পায়
লন্ডনের ‘কিলবার্ন অ্যান্ড কোম্পানি’। ১৮৯৭ সালের জানুয়ারিতে তার নাম বদলে হয়
‘দ্য ক্যালকাটা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কর্পোরেশন লিমিটেড’ (সি.ই.এস.সি), এ শহরের
সঙ্গে যার সংযোগ ছুঁয়েছে ১২৮ বছর। তবে কোম্পানির কাজকর্ম চলত লন্ডন থেকেই।
কলকাতায় বিদ্যুতের দামও ছিল লন্ডনের মতই। প্রতি ইউনিট এক টাকা।
কলকাতার ৫৬৭ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ২১ বছরের বরাত পায়
সি.ই.এস.সি। ১ হাজার পাউন্ডের মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল কোম্পানিটি। মাস
খানেকের মধ্যেই তা ফুলেফেঁপে ১ লক্ষ পাউন্ড ছাড়িয়ে যায়। ১৮৯৯ সালের ১৭ই
এপ্রিল— প্রিন্সেপ ঘাটের কাছে ইমামবাগ লেনে সি.ই.এস.সি-র প্রথম বিদ্যুৎ
উৎপাদন কেন্দ্র তৈরি করা হয়। এইভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় প্রধান শহরে
শুরু হয় বিদ্যুৎ-যুগ। ধীরে ধীরে কেরোসিনের আলো, গ্যাসের বাতির জায়গা নেয়
ইলেকট্রিক বাল্ব। হাত পাখার জায়গায় আসে ইলেকট্রিকের ফ্যান। আর ১৯০২ সাল থেকে
ঘোড়ায় টানা ট্রামের বদলে চলতে শুরু করে ইলেকট্রিকের ট্রাম।
কিন্তু, তখনও অনেকে বিদ্যুতের বদলে গ্যাসবাতি ব্যবহারের পক্ষপাতী ছিলেন।
কারণটা সহজে অনুমেয়। উজ্জ্বলতার বিচারে এবং টাকার সাশ্রয়ের দিক থেকে
গ্যাসবাতি তখনও অনেকটা এগিয়ে ছিল। শেষমেশ, গ্যাসবাতি না বিজলিবাতি— দুই
প্রযুক্তির মধ্যে কে সেরা তার ফয়সালা করতে ১৯১৩ সালে কলকাতা শহরে বসে একটি
অভিনব ভোটাভুটির আসর। বালিগঞ্জ স্টোর রোডে (বর্তমানে গুরুসদয় দত্ত রোড)
অনুষ্ঠিত সেই ঘরোয়া ভোটাভুটিতে গ্যাসবাতির কাছে গোহারা হেরে যায় বিজলিবাতি।
তবে সেদিন হয়তো অনেকেই এটা আন্দাজ করতে পেরেছিলেন, এই নতুন প্রযুক্তি খুব
তাড়াতাড়ি পুরনোর স্থান দখল করতে চলেছে।
ঘটলও তাই! রোজকার জীবনে ইলেকট্রিক আলোর কাছে ক্রমশ পিছিয়ে পড়তে পড়তে একটা
সময়ে শহর থেকে পাকাপাকিভাবে বিদায় নিল গ্যাসবাতি, জেগে রইল শুধু পরিত্যক্ত
বাতিস্তম্ভ। উত্তর কলকাতার অলিতে গলিতে আজও তার ফাঁকা ব্র্যাকেট কোনও বাড়ির
দেওয়ালে নিঃসঙ্গভাবে ঝুলে থাকতে দেখা যায়। তার মধ্যে কয়েকটিতে স্পষ্ট ভাবে
পড়া যায় কয়েকটি শব্দ: “MESSENGER & COMPANY, BIRMINGHAM, 1856”।
বর্তমানে অকেজো বস্তুটি, কলকাতার পথ-ঘাটে একদা গ্যাসবাতির রমরমার রেশ বহন করে
চলেছে।
.jpg)

1 মন্তব্যসমূহ
কোলকাতায় পাইপ লাইনে গ্যাস সরবরাহ হতো তাতে কেবল পথ বাতি ই জ্বলত এমন নয় । গৃহস্থ ঘরেও এর ব্যবহার ছিলো রান্নার জ্বালানি হিসেবে । শেষ পর্যন্ত এই কোলগ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহ করতো "ওরিয়েন্টাল গ্যাস কোম্পানি " । তাদের উৎপাদন কেন্দ্র ছিলো রাজাবাজার খাল পারে । । আজও রাস্তা টির নাম গ্যাস স্ট্রীট । অফিস ছিলো পার্ক স্ট্রিটের কুইন ম্যানশনে ।
উত্তরমুছুন